❤#দোয়া_কবুলের_গল্প❤


( আজকের গল্পটা সত্যিই বিস্ময়কর)


গতবছরের মাঝামাঝি সময়ের কথা। হঠাৎ একদিন আমি আমার ব্রেস্টে কিছুটা পরিবর্তন লক্ষ করি। খেয়াল করলাম,কেমন যেন টিউমারের মত ফোলা ফোলা লাগছে। ডাক্তার হওয়ার সুবাদে আমি চিনতে পারি এটা কার্সিনোমা। তারপরও আমি এ ব্যাপারে আরো ভালভাবে জানার জন্য আমার ম্যামকে জিজ্ঞাসা করি।

বলে রাখি, ম্যাম বলতে আমি যেখান থেকে ইন্টার্নি করেছিলাম তিনি সেখানকার ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল ডিউটি অফিসার ছিলেন। তো ম্যাম বললেন যে, তুমি জলদি একজন ভালো সার্জিক্যাল ডাক্তার দেখাও। কারণ এটার সিম্পটম বা লক্ষণ কোনোটাই ভালো না। একটা ব্রেস্টের অবস্থা তো খুবই খারাপ।হয়তো এটা কেটে ফেলে দিতে হবে।

ম্যাম আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে আরো বললেন, দেখো! আল্লাহ তায়ালা তার নেক্কার বান্দাদের শারীরিক মানসিক নানা রকম ভাবে কষ্ট দিয়ে তার ঈমানের পরীক্ষা নেন। তো এটাও আল্লাহ পাক পরীক্ষা করার জন্য দিয়েছেন। আরো কিছু কথা বলে তিনি আমাকে খুবই সাহস দিলেন। কারণ তিনি আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছিলেন। আর নিশ্চিত ভেবেই নিয়েছিলেন খুব ভয়ংকর কিছু ঘটবে আমার সাথে।

সেদিনের মতো চলে আসলাম। তারপর একজন সার্জনের খোঁজ করলাম। ইতোমধ্যে আমার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেল। প্রচুর জ্বর, সাথে বমি করতে লাগলাম। টিউমারের সাইজটা দিন দিন অস্বাভাবিক বড় হচ্ছিল, আর খুব বেশি পুঁজ বের হচ্ছিল আর ব্যাথা এতটা তীব্র ছিল যে, পেইনকিলারেও কাজ হচ্ছিল না ।

আমি খুবই টেনশনে পড়ে গেলাম। খুব খারাপ অবস্থা তখন আমার। ম্যামকে জানালে তিনি বললেন, তোমার দুটো ব্রেস্টই কেটে ফেলতে হবে। তোমার অবস্থা অনেক খারাপ। তখন আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম যে, সত্যি আমার অবস্থা খুবই খারাপ।

কিন্তু আমি হতাশ হইনি। "তাহাজ্জুদে" দাঁড়িয়ে অনেক কান্না করলাম। আল্লাহ কে বললাম- ইয়া আল্লাহ! আপনি যা করবেন তাতেই আমি সন্তুষ্ট। কারণ আপনিই উত্তম পরিকল্পনাকারী।আপনি যদি মনে করেন আমার দুইটা ব্রেস্টই কেটে ফেলা দেয়া উত্তম, তাহলে সেটাই আমার জন্য উত্তম।

কিন্তু মনে মনে খুব ভয় লাগতেছিল যে,আমি একটা অবিবাহিতা মেয়ে। কে বিয়ে করবে এমন একটা মেয়েকে? যার দুইটা ব্রেস্ট নাই তার ভবিষ্যৎ কী? তার বাচ্চারা কী খাবে! তার স্বামী কিংবা তার শ্বশুড়বাড়ির লোকেরা তাকে কিভাবে মেনে নিবে?

খুব টেনশনে পড়ে গেলাম। তাহাজ্জুদের নামাজে প্রতিদিন কান্না করে করে বললাম, যে আল্লাহ! আমার জন্য যেটা মঙ্গল সেটাই করুন।

এদিকে আমার আব্বু আম্মু দুজনেই অসুস্থ। প্রেশার এবং ডায়াবেটিসের রোগীর। এ জন্য তাদেরও কিছু বললাম না। কেউ জানে না। কাউকে জানাইনি শুধু ম্যাম জানেন আর আমি জানি। আর আল্লাহকে বললাম। তার কাছেই কান্নাকাটি করলাম। প্রচুর কান্না করলাম। সারারাত তাহাজ্জুদে কান্না করার পর দিনভর নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে চাইলাম।

প্রত্যেক ফরজ নামাজের পর মুনাজাত আর সুন্নাত নামাজ এবং সালাতুল হাজতের সিজদায় খুব দোয়া করতাম। প্রতিদিন ৫ হাজার বার ইস্তেগফার করতাম আর ৫ হাজার বার দোয়ায়ে ইউনুস পাঠ করতাম। আরো বিভিন্ন দোয়া ও অজিফা পড়ে খুব দোয়া করতাম।

একদিন আমার ম্যাম বললেন,তুই এখনো বসে আছিস? এটা কিন্তু ক্যান্সার, যে কোন মুহূর্তে ব্রেইনে চলে যেতে পারে। তুই জলদি সার্জিক্যাল ডাক্তার দেখা। যদি দুইটা কেটে ফেলার দরকার হয় দুইটাই কেটে ফেলে দে। দেরি করিস না। তোর অবস্থা কিন্তু ভালো না। শেষে কিন্তু অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যেতে পারে।

আমি ম্যাম কে বললাম, ম্যাম! আমার আব্বু আম্মু অসুস্থ। বাসায় কেউ জানে না। তো তিনি বললেন যে, না এখনি তোর জানাতে হবেনা, আমি এই যে ডাক্তারের ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি তুই এই ডাক্তারের সাথে দেখা করে কনসালট কর। দেখ মহিলা কি বলেন।

এরপর ওই ম্যাম এর কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম এবং যাওয়ার আগে দুই রাকাত সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহ পাকের কাছে বললাম, আল্লাহ! আপনি আমার জন্য যেটা করবেন সেটাই মঙ্গল। আপনিই উত্তম ফয়সালাকারী। যদি মনে করেন আজকে খারাপ কিছু হবে তাহলেও আলহামদুলিল্লাহ। আমি যেন মেনে নিতে পারি। শুধু আমার ধৈর্য শক্তিটা একটু বাড়িয়ে দেন।

খারাপ কিছু বললেও যেন আমি আপনার প্রতি শুকরিয়া আদায় করতে পারি। মুমিন বান্দার মত যে কোন সিদ্ধান্তে যেন আমি স্থির থাকতে পারি। সারা রাস্তা আমি অনেক দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে গেলাম।

ছোটবেলা থেকেই একটু ইসলামিক মাইন্ডেড এর ছিলাম। নফল সালাত আর বিভিন্ন দোয়া দরুদ মোটামুটি জানতাম আলহামদুলিল্লাহ। তো আমার জানা সব দু'আ পড়লাম। নিজের ভাষায় ও আল্লাহকে অনেক কিছু বললাম।

ম্যাম আসার কথা ৬ টায় কিন্তু সেদিন আসল দশটায়। সেখানে একটা নামাজের ঘর ছিল। এই সময়টুকুতে আমি আবারো নফল নামাযে দাঁড়িয়ে গেলাম। ম্যাম আসার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি দোয়া দুরুদ পড়লাম। ওজিফা আদায় করলাম। এর মধ্যে ম্যাম আসলেন।

আমি রুমে ঢুকার ঠিক ২-১ মিনিট আগে। আল্লাহর কী কুদরত! হঠাৎ আমার ব্যথাটা চলে গেল।জ্বরটাও কমে গেল বুঝতে পারছিলাম, আগে যে খারাপ সিম্পটম গুলো ছিলো সেগুলো আর নেই।

যত খারাপ লক্ষণ ছিল সব কোথায় যেন উধাও।

আগে ব্রেস্টগুলো যে ভারি ভারি লাগত, পুঁজ বের হতো এখন সব নাই হয়ে গেছে। আমার ব্রেস্টগুলো কেমন যেন হালকা হালকা অনুভব হচ্ছিলো। আমি নিশ্চিত বুঝতে পারছিলাম। আমার দোয়া কবুল হয়ে গেছে। আমার সাথে অলৌকিক কিছু হচ্ছে।

তবু ম্যাম কে দেখালাম। নতুন ম্যাম বললেন যে তোমার খারাপ কিছু না তোমার ব্রেস্টে একটা টিউমার আছে অপারেশন করে ফেলে দিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু পুরোটা ফেলতে হবে না শুধু টিউমারটা ফেলে দিলেই হবে। তখন আমি শুধু বললাম আলহামদুলিল্লাহ!

মনে মনে এই বিশ্বাস আসলো যে ওষুধ খেতে হবে না ইনশাআল্লাহ আমি এমনিতেই ভালো হয়ে যাবো। বাসায় এসে আবার দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে শুকরিয়া আদায় করলাম।

তারপরে তাহাজ্জুদ পড়ে আবার কান্নাকাটি করলাম। যে আল্লাহ আপনি যেহেতু ক্যান্সার থেকে টিউমারে নিয়ে এসেছেন, টিউমার থেকে আপনি পুরোপুরি ঠিক করে দিন। সব ক্ষমতা তো আপনারই হাতে ।

আমার আত্মবিশ্বাস ছিল আর যাই হোক আমার সাথে খারাপ কিছুই হবেনা। আগে যে মেডিসিন গুলো খেতাম সেগুলোও বাদ দিয়ে দিলাম। আর তার এক মাস পরে আমি খেয়াল করলাম যে, আলহামদুলিল্লাহ! টিউমারটা ছোট হয়ে আসছে।

তারপর আস্তে আস্তে একদম স্বাভাবিক হয়ে যাই। একদিন হঠাৎ করে হাত লাগছে দেখি টিউমার টা আর নেই। আমি কিভাবে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করব বুঝতে পারছিলাম না। অজান্তেই চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল বার বার।

এর কিছুদিন পর, ম্যাম কল করে আমার অবস্থা জানতে চাইলেন। বললাম ম্যাম টিউমারটা তো অপারেশন করার কথা ছিল কিন্তু এখন তো ওটা আর নেই। ম্যাম আশ্চর্য হলেন, জানতে চাইলেন কিভাবে কি হল। আমিও ভেবেছিলাম ম্যামকে সব বলব। কিন্তু সময় সুযোগের অভাবে আর বলা হয়ে উঠেনি।

আমার এই গল্প বলার একটাই উদ্দেশ্য। বোনরা! জীবনে যত বড় বিপদই আসুক। কখনো হতাশ হবেন না। যত অসম্ভব চাওয়াই থাকুক কখনো নিরাশ হবেন না। তাহাজ্জুদে, সিজদায় পড়ে, মোনাজাতে চাওয়ার মতো চাইতে পারলে অসম্ভব ও আল্লাহ সম্ভব করে দেন। যার জলন্ত প্রমাণ আমার এই ঘটনা।

লেখা~ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ডাক্তার বোন।

Leave a Comment